প্রচ্ছদ / আঞ্চলিক / বাহের দ্যাশের লোকসংস্কৃতি পরিচিতি
????????????????????????????????????

বাহের দ্যাশের লোকসংস্কৃতি পরিচিতি

রংপুরের জনগোষ্ঠী, ভাষা, ধর্ম, জীবন-জীবিকা, খাদ্যাভাস, বাসস্থান, পোষাক-পরিচ্ছদ :

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি সুপ্রাচীন জনপদ রংপুর। ‘রঙ্গরসে ভরপুর গরিয়সী রংপুর’- এই রংপুরের লোকসংস্কৃতিও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মত অত্যন্ত প্রাচীন এবং হিরন্ময় ঐতিহ্যমণ্ডিত ও সুসমৃদ্ধ। উত্তরের বিশাল হিমালয় পর্বতের পাদদেশীয় অঞ্চলে তিস্তা, ঘাঘট, যমুনেশ্বরী, আখিরা, মানাস, টেপা, চিকলী, করতোয়া ইত্যাদি নদীসহ অসংখ্য খাল-বিল পরিবেষ্টিত ভূ-প্রাকৃতিক, নৃতাত্ত্বিক, জাতিতাত্ত্বিক, সমাজতাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যম-িত প্রাচীন এই জনপদ রংপুর অঞ্চলে সমাজ গঠনের এক ধূসর অতীতে এখানকার লোকসংস্কৃতির উন্মেষ পর্বের সূত্রপাত ঘটে । পরবর্তীতে সুদীর্ঘকালের পথ-পরিক্রমায় বিপুল ও বিচিত্র উপাদানে বিকশিত ও সমৃদ্ধি লাভ করে সমাজ ও সভ্যতার ক্রম-উন্নতির প্রেক্ষাপটে প্রয়োজনীয় রূপান্তর তথা গ্রহণ-বর্জনের মধ্যদিয়ে বর্তমানকে ছুঁয়ে তা অনাগত ভবিষ্যতের পথে অগ্রসরমান।

জনগোষ্ঠী : ‘আধুনিক বাঙালি সঙ্কর সৃষ্টি’-বাঙালি জাতির নৃতাত্ত্বিক পচিয়ের ক্ষেত্রে এই হলো সংক্ষিপ্ত সার। প্রাচীনকালে এদেশে একক নামের ও অভিন্ন নৃগোষ্ঠীয় কোন জাতির পরিচয় মেলেনা। মানব ইতিহাসের সুদীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় নানা নৃগোষ্ঠীয় মানুষের আগমন ঘটেছে এ ভূখণ্ডে এবং এদের মধ্যে ঘটেছে ব্যাপক রক্তসাঙ্কর্য। এই রক্ত-সাঙ্কর্যের ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে এ দেশের মূল জনজাতিধারা ও জাতিসত্তা। উত্তরবঙ্গের রঙ্গপুর তথা রংপুর অঞ্চলের জনজীবনেও এই ধারার প্রভাব বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ভূখণ্ড উত্তরাঞ্চলে মানব বসতি এবং সমাজ ও সভ্যতার গোড়াপত্তনও হয়েছিল সর্বপ্রথম এমনটা ধারণা করা অযৌক্তিক হবেনা। রংপুর অঞ্চলের আবহাওয়া ও ভূ-প্রকৃতি মানুষের বসবাসের এবং কৃষিজাত ফসল উৎপাদনের জন্য অনুকূল হওয়ায় এ অঞ্চলে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই মানব বসতি গড়ে উঠেছে। নৃতাত্ত্বিকদের মতে রংপুর তথা উত্তরবঙ্গের আদি বাসিন্দা ছিল নিষাদ, শবর, পুলিন্দ, কিরাদ প্রভৃতি জনজাতি। প্রায় ৫ হাজার বছর আগে এ অঞ্চলে বসবাসকারী এসব জনজাতির মানুষরা ছিল ‘নিগ্রোবুট’ নৃগোষ্ঠীয়। কৃষি কাজ ও পশুপালনের কৌশল এদের জানা ছিলনা। বুনো ফল-মূল এবং পশু-পাখি শিকার ছিল তাদের জীবিকার মূল উৎস। এরপর আসে ‘অস্ট্রিক’রা। প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর পূর্বে আসামের উপত্যকা পার হয়ে এরা উত্তরবঙ্গের সমতলভূমিতে প্রবেশ করে। অস্ট্রিকরা নিগ্রোবুটকের চেয়ে অনেকটাই অগ্রসর ছিল এবং ধীরে ধীরে নিগ্রোবুটদের স্থান দখল করে। এরা পশুশিকার করার পাশাপাশি মাছ ধরা, পশুপালন ও কৃষিকাজ জানতো। এদেশে অস্ট্রিকরাই কৃষি সভ্যতার গোড়াপত্তন করে। এরা প্রথমে নদীতীরবর্তী অঞ্চলে বসবাস করত। পরে নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। বাঙালির ভাত-মাছ খাওয়া, জমি চাষে লাঙলের ব্যবহার , নীলচাষ, কলাচাষ, ঝাঁড়ফুক, সাপের বিষ নামানো, ভূতপ্রেতে বিশ্বাস, হিসেব করার জন্য কুড়ি, গণ্ডা ইত্যাদির ব্যবহার অস্ট্রিকদের দান। অষ্ট্রিকরা খর্বদেহী, দীর্ঘশিরষ্ক ও বিস্তৃতনাক বিশিষ্ট। এদের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাসীদের বৈশিষ্ট্যের অনেক মিল রয়েছে। নৃতত্ত্বের ভাষায় এরা ‘প্রোটো-অস্ট্রেলয়েড’ বা ‘ভেড্ডি’ নামে পরিচিত। রংপুরের আদি অধিবাসীদের মধ্যে ‘অস্ট্রিক’নৃগোষ্ঠীয় প্রভাব বিদ্যমান।

অস্ট্রিকদের পরে উত্তরাঞ্চলে আসে ‘দ্রাবিড়’রা। এদের সাথে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের জাতিগুলোর মিল রয়েছে। নৃতত্ত্বের ভাষায় এরা ইন্দো-ভূমধ্য নৃগোষ্ঠীয় হিসেবে চিহ্নিত। এরা মধ্যমদেহী, কম বিস্তৃৃত নাক বিশিষ্ট এবং দীর্ঘশিরষ্ক। অস্ট্রিকদের প্রাথমিক পর্যায়ের কৃষিবিদ্যাকে তারা আরও উন্নত করেছিল এবং নগর সভ্যতার গোড়াপত্তন করেছিল।

দ্রাবিড়দের পর এদেশে আগমন ঘটে ‘আলপীয়’ নৃগোষ্ঠীয় মানুষের। তাদের ছিল দীর্ঘ থেকে মধ্যম দেহ, সুন্দর নাক, তরঙ্গায়িত চুল, প্রশস্ত শির এবং হালকা গোলাপী থেকে বাদামী রঙের দেহ। তারপরে আসে ‘ইন্দো-আর্য’ বা ‘উত্তর-ইণ্ডিজরা’। এরা দীর্ঘদেহী, দীর্ঘশিরষ্ক, দীর্ঘলম্বা নাক বিশিষ্ট এবং ঢেউ খেলানো চুলের অধিকারী।

খ্রিষ্ট জন্মের প্রায় দেড় হাজার বছর আগে আর্যরা এসে এ অঞ্চলের আদি বাসিন্দাদের উপর ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সকল দিক থেকেই ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। তারপরেও স্থানীয়দের সঙ্গে তাদের অনেক ক্ষেত্রে অন্তর্মিলন ঘটে।

উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে এ দেশে আগত ইন্দো আর্য বা উত্তর ইন্ডিজদের আগেই উত্তর-পূর্ব দিক থেকে এসেছিল মঙ্গোলীয় নৃগোষ্ঠীয় মানুষ। মঙ্গোলীয়দের নাক চ্যাপ্টা, গালের হাড় উঁচু। দাড়ি গোঁফ কম। উত্তরবঙ্গ ও পূর্ব বঙ্গের বাঙালির মধ্যে এ উপাদান বেশি করে বিদ্যমান।

মঙ্গোলীয়দের অনেকগুলো শাখা-প্রশাখা ছিল। এ নৃগোষ্ঠীর দক্ষিণ শাখার উদাহরণ হলো- তিব্বতীয় ও চীনা জাতি। এদের আবাসস্থল মঙ্গোলিয়া, চীন, তিব্বত, নেপাল, জাপান, কোরিয়া, মায়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের উত্তর-পূর্ব পার্বত্য অঞ্চল।

ইন্দো-মঙ্গোলীয় চীন-তিব্বত-বর্মী ভাষাগোষ্ঠীয় লোকেরা যারা ‘বোদো’ বা ‘বড়ো’ নামে পরিচিতÑ তিব্বতে বসবাস করার সময় ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন শাখা অতিক্রম করে উত্তর-পূর্ব ভারতে পাটের কাপড়ের ব্যবসা করতো। এই বড়ো জনজাতি ক্রমশঃ ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা, বর্তমান কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, রংপুর এবং দিনাজপুর জনপদে তাদের আধিপাত্য বিস্তার করে।

রংপুর এর নামকরণ এবং এ অঞ্চলের ভাষা, সমাজ সংস্কৃতিতে ‘বড়ো’ জাতির প্রভাব ব্যাপকভাবে বিদ্যমান। বড়ো শব্দে ‘রঙ্গ’ বা ‘রং’-অর্থ আনন্দ এবং ‘পুর’- অর্থ নগর বা স্থান। সুতরাং, রঙ্গপুর তথা রংপুর অর্থে ‘আনন্দময় স্থান’ বুঝায়।

অপরদিকে, বড়ো জনজাতির ভাষার সঙ্গে স্থানীয়দের ভাষার সংমিশ্রণে ‘কামরূপী’ ভাষার সৃষ্টি হয়। কামরূপী থেকে কালক্রমে সৃষ্টি হয় ‘বঙ্গকামরূপী’ ভাষা, যাকে আধুনিক বাংলা ভাষার অব্যবহিত পূর্ববর্তী রূপ বলে মনে করা হয়। রংপুর দিনাজপুরের কিছু অংশ, ভারতের জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, কোচবিহার ও ধুবড়ি অঞ্চলে বঙ্গকামরূপী ভাষার প্রচলন ছিল। রংপুরের বিশেষ বৈশিষ্টমণ্ডিত আঞ্চলিক ভাষায় বঙ্গকামরূপীর ব্যাপক প্রভাব আজও বিদ্যমান।

অষ্টম শতাব্দী থেকে এ দেশে শুরু হয় ‘সেমিটিক’দের আগমন। ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে মুসলমান শাসকদের ছত্রছায়ায় এই ধারা ক্রমবর্ধিত হতে থাকে। পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে ধর্মপ্রচারক, পরিব্রাজক এবং বণিকবেশে আগমন শুরু হয় খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী ইউরোপীয়দের। অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বেই বাণিজ্য সূত্রে আনাগোনা ঘটে পতুর্গীজ, ইংরেজ, দিনেমার, ফরাসী, আর্মেনীয়দের। রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলেও এদের পদচারণ ঘটে।

এভাবে বিভিন্ন সূত্রে এ অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে নানা নৃগোষ্ঠীয় এবং নানা জাতি-উপজাতি, ধর্ম-বর্ণের মানুষের সংমিশ্রণ ঘটে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলার উত্তরাঞ্চলীয় জনপদগুলোও পরিণত হয় এক ‘রক্তসঙ্কর’ জনগোষ্ঠীর আবাসভূমিতে। বর্তমান রংপুরের মূল জনগোষ্ঠী এই ধারারই উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে।

সংক্ষেপে বলা যায়, সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারাবাহিকতায় এ জেলায় বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীয় ও জনজাতির মানুষের আগমন ঘটেছে। এদের সংমিশ্রণে বিকাশলাভ করেছে মূল জনজাতি ধারা। মোগলপূর্ব সময় পর্যন্ত এ অঞ্চলের জনধারায় ব্যাপক পরিবর্তনের কোন হাওয়া লাগেনি। বাংলাদেশ তথা উত্তর ভারতের নানাস্থানে সংঘটিত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় অস্থিরতা ও সংঘাত এ দেশের অন্যান্য অঞ্চলকে বিপুলভাবে নাড়া দিলেও বৃহত্তর রংপুরের হৃদস্পন্দনে নৃগোষ্ঠীক সত্তা পরিবর্তনের প্রবণতা উলে¬খযোগ্য ছিলনা। এই অঞ্চলে বসবাসকারী স্থায়ী অধিবাসীরা অর্থাৎ কোচ, মেচ, পলিয়া, রাজবংশী, খেন এবং কিছু সংখ্যক তেলেঙ্গা, গারো, রাভা, নাট, কাছারি ইত্যাদি জনজাতি তাদের বৃহত্তর মঙ্গোলীয় নৃতাত্ত্বিক সত্তায় অন্তর্মিলনের মাধ্যমে বহাল ছিল নিকট অতীত পর্যন্ত। কালের প্রবাহে এদের অনেকের অস্তিত্বই আজ বিলীন হয়েছে।

জনসংখ্যা : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জেলা পরিসংখ্যান-২০১১ অনুযায়ী রংপুর জেলার জনসংখ্যা- ২৮,৮১,০৮৬ জন। ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যা মুসলমান-২৬,০৬,২৬৩; হিন্দু-২,৫৮,৬৮৪; বৌদ্ধ-১,৮৬৩; খ্রিস্টান-৬,৫৯৪ এবং আন্যান্য ধর্মাবলম্বী-৯,৬৮২ জন ।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী : মূল জনজাতিধারা ছাড়াও কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীয় (আদিবাসী) উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ এ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বসবাস করে। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে এদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীয় হিসেবে অভিহিত করে ৪টি গ্রুপে চিহ্নিত করা হয়েছে । এগুলো হচ্ছে- ওরাওঁ , সাঁওতাল, বর্মণ এবং অন্যান্য । রংপুর জেলায় এদের মোট জনসংখ্যা -১৮,৫৬১ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এদের মধ্যে ওরাওঁ – ৯,৮৭৫, সাঁওতাল – ৫,৬৪৫, বর্মণ- ৫৬৫ এবং অন্যান্য- ২,৩৪১ জন । ২০১১ সালের আদম শুমারিতে এই প্রথম রংপুর জেলায় ‘বর্মণ’ নামে একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যান্য শ্রেণীর মধ্যে মু-া, মালো, মালপাহাড়ি, কোলকামার, মুশাহার ইত্যাদি গোষ্ঠী অন্তর্ভূক্ত রয়েছে।

পেশা : বাংলাদেশে মূলত: কৃষিনির্ভর দেশ। রংপুরসহ এ দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষির ঐতিহ্য এর মানববসতি, সমাজ ও সভ্যতার মতই অতি প্রাচীন। উত্তরবঙ্গের একটি অংশের প্রাচীন নাম ছিল ‘পুণ্ড্র’ অনার্য ভাষায় ‘পুণ্ড্র’ মানে ‘কৃষকজাতি’। এ অঞ্চলে আগত অস্ট্রিকদের হাতে কৃষি সভ্যতার সূচনা হয়। উল্লেখ্য, ভৌগলিক অবস্থান ও আবহাওয়াগত অনুকুল পরিবেশের কারণে রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের ভূমি কৃষির জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় এ অঞ্চলে কৃষির বিকাশ দ্রুত ত্বরাণি¦ত হয়। কালক্রমে জীবন ও জীবিকার তাগিদে অন্যান্য পেশার উদ্ভব ঘটে।

কৃষিসহ অন্যান্য পেশাভিত্তিক কর্মকা-কে ঘিরে উদ্ভব ঘটে বিভিন্ন ধরণের শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্যের। ভূমির উপর কর্তৃত্ব সৃষ্টির পর উদ্ভব ঘটে ভূস্বামী, জমিদার, জোতদার শ্রেণীর। পাশাপাশি সৃষ্টি হয় কৃষিজীবী ও কৃষিক্ষেত্রের শ্রমিকসহ নানা শ্রেণী ও পেশার শ্রমজীবী মানুষের।

বর্তমানে রংপুরের শতকরা ৮০ ভাগের বেশি মানুষ কৃষিজীবী, অবশিষ্টদের মধ্যে রয়েছে- ব্যবসায়ী, চাকুরীজীবী এবং বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার শ্রমজীবী মানুষ।

ধর্ম : প্রাচীন কালে রংপুর অঞ্চলের মানুষ মিশ্র লোকধর্ম পালন করতো। সেই সূত্রে সূদীর্ঘকালে এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে লোকধর্মপূষ্ট নানা বিশ্বাস, সংস্কার, কুসংস্কার, আচার-অনুষ্ঠান, পূজা-পার্বণ ইত্যাদির বিকাশ ঘটে। ঐতিহ্যগতভাবে সুদীর্ঘকাল এই মিশ্র লোকধর্মের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এসে নিকট অতীতে রংপুর অঞ্চলের মানুষ বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান ইত্যাদি ধর্ম গ্রহণ করে। তবে এ সব ধর্মের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার ঘটলেও ঐতিহ্যগতভাবে প্রচলিত বিভিন্ন লোকধর্মের প্রভাব আজও এ অঞ্চলে বিদ্যমান রয়েছে।

মানুষের মধ্যে দৈনন্দিন জীবনের নানা কমর্কা-কে কেন্দ্র করে সমাজে প্রচলিত লোকধর্ম প্রভাবিত ও ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান, বিশ্বাস-সংস্কার, কু-সংস্কার ইত্যাদি এখনও বিদ্যমান রয়েছে।

১৯৯১ এর আদমশুমারী রিপোর্ট অনুযায়ী রংপুর জেলায় ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যার হার ছিল-৮৯.৬০% মুসলমান, ৯.৫৮% হিন্দু, .১৪% বৌদ্ধ, .২৫% খ্রিষ্টান এবং .৪৩% অন্যান্য ধর্মালম্বী।

বর্তমানেও রংপুর জেলায় বসবাসকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ধর্মের দিক থেকে মুসলমান। এছাড়াও রয়েছে হিন্দু বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান এবং প্রকৃতির পুজারী আদিবাসী সম্প্রদায়। ২০০১ সালের আদমশুমারী রিপোর্ট অনুযায়ী রংপুর জেলায় বসবাসকারী মোট জনসংখ্যা- ২৫,৪২,৪৪১ জন। এদের মধ্যে- ২২.৯৬,৭৯০ জন মুসলমান, ২.২৯,৯৬৩ জন হিন্দু, ৫,৭৮১ জন বৌদ্ধ, ২,০৬০ জন খ্রিষ্টান, ৭,৮৪৭জন অন্যান্য ধর্মালম্বী এবং ১২,৯৯০ জন উপজাতি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জেলা পরিসংখ্যান-২০১১ অনুযায়ী বর্তমান রংপুর জেলার ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যা- মুসলমান-২৬,০৬,২৬৩; হিন্দু-২,৫৮,৬৮৪; বৌদ্ধ-১,৮৬৩; খ্রিস্টান-৬,৫৯৪ এবং আন্যান্য ধর্মাবলম্বী-৯,৬৮২ জন ।

তবে ধর্মভিত্তিক এই বিভাজন সত্ত্বেও সকল সকল ধর্মের মানুষের মধ্যে আবহমান কাল ধরে চমৎকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বিরাজমান রয়েছে। নিজ নিজ ধর্মীয় কর্মকা- ও অনুষ্ঠানাদি পালনের ক্ষেত্রে সকলেই অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করে। বিভিন্ন ধর্মের প্রধান প্রধান ধর্মীয় উৎসবগুলো সকল ধর্মের মানুষের স্বতঃফূর্ত ও উদার অংশগ্রহণে মহামিলন মেলায় পরিণত হয়।

ভাষা : রংপুরের অধিবাসীদের মূল ও প্রধান ভাষা বাংলা। প্রত্যেক ভাষারই প্রমিত রূপের পাশাপাশি আঞ্চলিক বা উপভাষা রয়েছে। আর ভাষার প্রকৃত ও স্বাভাবিক প্রাণপ্রবাহ সচল থাকে তার উপভাষার মধ্য দিয়ে। ম্যাকসমূলার বলেছেন `The real and natural life of language is in its dialects. ’

বাংলা ভাষাও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলা ভাষার যেমন আছে পরিশীলিত প্রমিত রূপ, তেমনি বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক গ্রামীণ জনপদে প্রচলিত রয়েছে আঞ্চলিক বাংলাভাষা বা উপভাষা। রংপুর অঞ্চলেও পরিশীলিত ও মার্জিত বাংলা ভাষার সমান্তরাল আঞ্চলিক বাংলাভাষা বা উপভাষা প্রচলিত রয়েছে। বিশেষ করে রংপুরের গ্রামাঞ্চলের মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবন যাত্রায় এই ভাষা ব্যবহার করেন। এ ভাষার উচ্চারণগত সহজবোধ্যতা, সাবলীলতা ও শ্রুতিমাধুর্য অসামান্য। রংপুরের এ আঞ্চলিক ভাষায় রচিত হয়েছে অসংখ্য লোকসাহিত্য-সঙ্গীত, প্রবাদ-প্রবচন, ধাঁধা ইত্যাদি। কেবলমাত্র লোকসাহিত্য ও সঙ্গীতেই নয় প্রাচীন ও মধ্যযুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের অনেক কবি-সাহিত্যিকও তাদের সাহিত্যকর্মে রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার সার্থক প্রয়োগ করেছেন।

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদের অনেক পদে রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার রীতি ও শব্দের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। যেমন-

‘টালত ঘর মোর নাহি পরবেসী।

হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী ॥’- ( ৩৩ নং পদ, ঢেন্ঢপাদানম্)

অধিকরণ কারকে অ, এ, তে বিভক্তির স্থলে ‘ত’ বিভক্তির প্রয়োগ রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যেমন- হাটোত, গাছোত ।

অন্যত্র-

‘অপনা মাংসে হরিণা বৈরী।

খনহ ন ছাড়ই ভুসুকু অহেরী ॥

তিন নছুবই হরিণা পিবই ন পাণী।

হরিণা হরিণীর নিলঅ ন জানী ॥

তরঙ্গতে হরিণার খুর ন দীসই।

ভুসুকু ভণই মূঢ়া-হিঅহি ন পইসই ॥’-( ৬ নং পদ, ভুসুকুপাদানম্)

ক্রিয়াপদের আগে নঞ্চর্থক অব্যয়ের ব্যবহার রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার আর একটি বৈশিষ্ট্য যেমন- না শোনং, না যাইম, না খাইম ইত্যাদি।

ষোড়শ শতকের কবি মুহম্মদ কালার ‘নেজাম পাগলার কেচ্ছা’, অষ্টাদশ শতকের কবি হেয়াত মামুদের রচনায় রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার অনেক শব্দ রয়েছে । বেগম রোকেয়ার রচনায়াতেও রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার অনেক শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। পরবর্তী সময়ে নাট্যকার তুলসী লাহিড়ীর নাটক ‘ছেঁড়াতার’, সৈয়দ শামসুল হক এর নাটক ‘নুরলদীনের সারাজীবন’, নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদের কাব্য ‘হামার অমপুর’, আবুল কাশেমের গ্রন্থ ‘হামার দ্যাশ হারাগাছ’, সিরাজুল ইসলাম সিরাজের নাটক ‘ মরা মানুষের মিছিল’, আনিসুল হক এর নাটক ‘নাল পিরান’, মকসুদুল হক এর গীতিনাট্য ‘শঙ্খামারীর ঘাট’, সাখাওয়াত হোসেনের নাটক ‘বাহে নিধূয়া পাথার’, নাসিমুজ্জমান পান্নার ‘নাকফুল’ , মুহম্মদ আলীম উদ্দিনের উপন্যাস ‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে’ ইত্যাদিসহ বিভিন্ন গ্রন্থে রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার সফল প্রয়োগ ঘটেছে। মতিউর রহমান বসনীয়া ‘রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান’ রচনার পাশাপাশি অনেক কবিতা লিখেছেন এ ভাষায়। সর্বোপরি, রংপুরের লোকজীবন ও লোকসংস্কৃতি মূলত গড়ে উঠেছে এই আঞ্চলিক উপভাষাকে কেন্দ্র করেই।

উল্লেখ্য, রংপুরের এই আঞ্চলিক উপভাষা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বিশেষ বৈশিষ্টমণ্ডিত। পণ্ডিতেরা ভাষাতাত্ত্বিক বিচারে রংপুরের এই আঞ্চলিক উপভাষাকে উদীচ্য বা বরেন্দ্র উপভাষার গোত্রভূক্ত এবং ‘বঙ্গকামরূপী’ ভাষার উত্তরসূরী বলে চিহ্নিত করেছেন।

প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য যে, বাংলা ভাষা সংস্কৃত ভাষা থেকে উদ্ভূত- তথা ‘বাংলা সংস্কৃতের দুহিতা’- সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতেরা এমন অভিমত ব্যক্ত করলেও ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ অন্যান্য গবেষকরা এইমত সমর্থন করেন না। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভাষাতত্ত্বিক বিভিন্ন প্রমাণাদির প্রেক্ষিতে জোর দিয়ে বলেন “বাঙ্গালা সংস্কৃতের দুহিতা নহে, তবে দূর সম্পর্কীয়া আত্মীয়া বটে।”* (* ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত,পৃ- ২৮) এ মতের সমর্থক পণ্ডিতদের মতে, সংস্কৃত ভাষার সমসময়ে প্রচলিত আদিম ‘প্রাকৃত’-এর পরবর্তী বিভিন্ন প্রাকৃতের মধ্যে গৌড়ীয় প্রাকৃত হতে গৌড়ীয় অপভ্রংশের মধ্যদিয়ে প্রাচীন বাংলা ভাষার উৎপত্তি ঘটেছে এবং তার অব্যবহিত পূর্বরূপ বঙ্গ-কামরূপী ভাষা। এবা বঙ্গ-কামরূপী ভাষার প্রচলন ছিল রংপুর দিনাজপুরের কিছু অংশে, ভারতের জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, কোচবিহার ও ধুবরি অঞ্চলে।* (*মুহম্মদ আলীম উদ্দিন, রংপুর সংবর্তিকা, রংপুর সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদ

About Online Desk

The Daily Rangpur Chitra is the highest circulated regional daily newspaper of Rangpur Division, Bangladesh

Check Also

রংপুরে দূর্নীতি বিরোধী মতবিনিময়

মহানগর প্রতিনিধি: দুর্নীতি বিরুদ্ধে এক সাথে,স্থানীয় পর্যায়ে দূর্নীতি বিরোধী সামাজিক আন্দোলনে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ বিষয়ক …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *