প্রচ্ছদ / বাংলাদেশ / মোবাইলে বিএনপির ছবি পাইলেই ধরা

মোবাইলে বিএনপির ছবি পাইলেই ধরা

শাহবাগ থানার ফটকে জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে চল্লিশজনের মতো নারী-পুরুষ। ফটক বন্ধ। কারও হাতে খাবার, কারও ওষুধ। এসব পৌঁছে দেওয়ার জন্য থানার ফটক আগলে দাঁড়ানো আনসার সদস্য নূরনবীকে পীড়াপীড়ি করছেন অনেকে। চলছে কানে-মুখে ফিসফাস।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর শাহবাগ থানায় এমন দৃশ্য দেখা যায়। আগত ব্যক্তিদের প্রায় সবারই স্বজন বা বন্ধুকে গত বুধবার হাইকোর্ট ও দোয়েল চত্বর এলাকা থেকে বিএনপির কর্মী সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এঁদের কেউ বলছেন, তাঁরা সাধারণ মানুষ বিনা কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন, তবে যাচাই করে পুলিশ অরাজনৈতিক লোকদের ছেড়ে দিচ্ছে। আবার কেউ বলছেন, পুলিশ টাকা খেয়েও তাঁদের সন্তানকে ছাড়েনি।

পুরান ঢাকার বকশীবাজারে স্থাপিত বিশেষ আদালতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলার শুনানি চলছে। এই শুনানি থেকে ফেরার পথে গত মঙ্গলবার বিএনপির মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা হয়, প্রিজন ভ্যান ভেঙে দুই নেতা-কর্মীকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। সেই থেকে ওই এলাকায় ধরপাকড় চলছে। বুধবার কেবল শাহবাগ থানায় আটক করা হয়েছিল ৬০ জনকে।

জামালপুরের বকশীগঞ্জ থেকে দোকানের মালামাল কিনতে এবং মামলাসংক্রান্ত কাজে ঢাকায় এসে আটক হন মো. মঞ্জু ও সুজন সরকার। বুধবার দিবাগত রাতে মঞ্জুকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সুজনের অপেক্ষায় গতকাল মঞ্জু শাহবাগ থানার ফটকে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেখানে মঞ্জু বলেন, বকশীগঞ্জ থেকে এসে বুধবার সকালে মিটফোর্ডের ওষুধ বাজার থেকে ওষুধের দোকানের জন্য মালামাল কেনাকাটা করে দুপুরের দিকে হাইকোর্টে আসেন মামলার কাগজ তুলতে। হাইকোর্ট এলাকায় রিকশা থেকে নামার পরপরই পুলিশ তাঁকে ও সুজনকে গাড়িতে তোলে। যাচাইয়ের পরে বুধবার রাত সাড়ে তিনটার দিকে মঞ্জুকে ছেড়ে দেওয়া হলেও সুজনকে ছাড়েনি পুলিশ। সুজন ছাড়া পাবেন—এই আশাতে দিনভরই থানা ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে মঞ্জু ও সুজনের বোন বিউটি।

মঞ্জু বলেন, পুলিশ রাতভর আটক লোকজনের নাম-পরিচয় আর মোবাইল ফোন নিয়ে যাচাই করেছে। চাকরিজীবী বা বিভিন্ন পেশায় যাঁরা নিয়োজিত, তাঁরা প্রমাণ দেখাতে পারলে ছেড়ে দিছে পুলিশ। আর যাঁদের মোবাইলে বিএনপির মিছিলের ছবি বা বিএনপি সমর্থনের কোনো আলামত পাওয়া গেছে, তাঁদেরই মামলার আসামি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমি তো ভাবছি পুলিশে ট্যাকা খাইবো। বাড়িত্তে ৩০ হাজার ট্যাকাও আনছি। তয় দারোগারা কইছে, বড় স্যারেরা ডিসিশন দিবো। এক এসি স্যার আইসা রাইতে আমারে ছাড়লো।’

বুধবার হাইকোর্ট এলাকা থেকে আটক হন গাড়িচালক মো. রুবেল। রুবেলের এক আত্মীয় এসেছেন সঙ্গে আড়াই বছরের ছেলেকে নিয়ে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল সকালে থানার ফটকে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যকে দুই শ টাকা দিয়ে হাজতে নাশতা পৌঁছে দিয়েছেন। পুলিশ যাতে না ধরে, সে জন্য সঙ্গে আড়াই বছরের ছেলেকে নিয়ে বোনজামাইকে দেখতে এসেছেন তিনি। রুবেল কোনো রাজনীতিতে যুক্ত কি না জানতে চাইলে ওই আত্মীয় বলেন, ‘দল (বিএনপি) করে না, মনে মনে পছন্দ করে। সে জন্য আইছিলো।’

বিএনপির আরেক নেতা আজিজুল হকের (সোহেল) জন্য ওষুধ, ইনসুলিন নিয়ে এসেছেন কয়েকজন। তাঁদের একজন বলেন, কিছুক্ষণ পরপর তাঁর ওষুধ সেবন করতে হয়, ইনসুলিনও নিতে হয়। সকালে একবার দিয়েছেন, এখন আবার দিতে হবে।

এদিকে থানার ফটকে দাঁড়ানো বয়স্ক একজন লোক বলেন, তাঁর ছেলেকে বুধবার বিকেলে আটক করা হয়। বুধবার রাতেই তিনি এক দারোগাকে ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন ছেলেকে ছেড়ে দেওয়ার শর্তে। তবে গতকাল সকালে এসে শুনেছেন, রাতে তাঁর ছেলেকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে মারধরও করা হয়েছে। লোকটি দারোগার নাম বলতে পারেননি।

রাতে ছাড়া পাওয়া আরেক ব্যবসায়ী বলেন, থানাহাজতে খাবারদাবারের সমস্যা নেই। বেরাইদের বিএনপি নেতা মাহফুজ চেয়ারম্যানের জন্য অনেক খাবার এসেছে। সেগুলো সবাই মিলে খেয়েছেন। পুলিশ প্রচুর যাচাই-বাছাই করছে। কারও ন্যূনতম বিএনপি সম্পৃক্ততা পেলেই ছাড়া হচ্ছে না।

তিনজন নারী থানার পাশের বেঞ্চে বসে জটলা করছিলেন। তাঁদের একজনের ছেলে নিউমার্কেট থানা ছাত্রদলের নেতা। তিনি নাম বলতে চাননি। ওই নারী বলেন, ‘হুনছি পার্টি থিকা উকিল দিবো। এহন যদি না দেয়, তাইলে আমার পোলাডার কী অইব! আমি তো কাউরে চিনিও না। সহাল থিকা বইসা এহনো একবার দেহাই করতে পারিনি।’

দক্ষিণখান এলাকা থেকে আসা দুই তরুণ জানালেন, তাঁদের এলাকার কয়েকজন বিএনপির নেতা-কর্মী এখানে আটক হয়েছেন। তাঁরা এসেছেন তদবির করতে। এর মধ্যে থানার ওসির ভাগনে পরিচয়দানকারী এক যুবক তাঁদের কাছে ১০ হাজার টাকা চেয়েছেন। তাঁরা ধমক দেওয়ার পরে ওই যুবককে এখন আর দেখা যাচ্ছে না।

About Online Desk

The Daily Rangpur Chitra is the highest circulated regional daily newspaper of Rangpur Division, Bangladesh

Check Also

প্রশ্ন ফাঁস:
সদিচ্ছা থাকলেই সবাই ধরা পড়বে: কায়কোবাদ

প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা তদন্তে হাইকোর্টের দুটি কমিটি করে দেয়ার আদেশ এখনও কমিটির সদস্যদের কাছে যায়নি। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *