এমপির স্বামী বলে কথা!

২০১৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর একটি টেলিভিশনের খবরে দেখা যায় তামিল সিনেমার স্টাইলে এক ব্যক্তি পিঠে শটগান ঝুলিয়ে জমি জবরদখলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আর তার সঙ্গী ক্যাডাররা তার হুকুম অনুসারে জমি মালিকদের ঠেঙাচ্ছে।

দিনদুপুরে জমি মালিকদের পিটিয়ে উচ্ছেদ করে দেওয়া হচ্ছে। আর ওই জমিতে ‘সুলতান আহমেদ মৃধা এই জমির মালিক’ লেখা সাইনবোর্ড খাড়া করা হচ্ছে। কেউই টুঁ শব্দটিও করছে না। অডিও-ভিজুয়াল এই প্রতিবেদনের পর ভুক্তভোগীরা আশা করেছিল মৃধার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন। তা কিন্তু হয়নি। উল্টো ‘ঠেঙানো শিল্পের গুরু’ নামে পরিচিত মৃধার প্রতি প্রশাসনের সমীহ আরও বেড়ে গেল। ভুক্তভোগীরা বলেন, এরপর থেকে সুলতান মৃধা শুধু পরের জমির দিকেই লোভাতুর দৃষ্টি ফেলতে ফেলতেই দিনাতিপাত করছেন। এভাবেই তিনি আমতলী থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত নিজ নামাঙ্কিত সাইনবোর্ড ঝুলিয়েই চলেছেন। বেপরোয়া এই ব্যক্তিকে রোখার সাধ্য যেন কারও নেই।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য লুত্ফুন নেছার স্বামী এই সুলতান মৃধা। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় লুত্ফুন নেছা তার হলফনামায় লিখেছিলেন তার কৃষি জমি আছে দুই একর। স্বামীর নামে আছে সাত একর ৫০ শতাংশ। আর অকৃষি জমি নিজের নামে তিন একর আর স্বামীর নামে সাত শতাংশ। স্থানীয়রা জানান, এখন এই দম্পতি কত জমির যে মালিক তা তারা নিজেরাও জানেন না। তবে যেটা বেশি বলাবলি হয় সেটা হচ্ছে, মৃধা একসঙ্গেই দখল করে নিয়েছেন ৩০০ একর। সামান্য বিরোধ আছে এরকম জমির সন্ধান পেলেই ক্যাডারসজ্জিত হয়ে মৃধা সেখানে ছুটে যান এবং নিজের নামাঙ্কিত সাইনবোর্ডটি ঝুলিয়ে দেন।

অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দারা মৃধা দম্পতির পেশিশক্তির দাপটে দিশাহারা। স্বামী-স্ত্রীর অত্যাচার, নির্যাতন, স্থানীয় বাসিন্দাদের ভিটেছাড়া করা থেকে শুরু করে সরকারি খাস জমি দখলের ঘটনায় ত্যক্ত-বিরক্ত স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও। মৃধা দম্পতির একক সিদ্ধান্তেই চলছে টেন্ডারবাজি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্য। শুধু তাই নয়, মৃধার শ্যালক খোকন মৃধাও ‘প্রতিভা’র পরিচয় দিচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে, একজন দাপুটে শ্যালক হিসেবে তিনি একটি মাদ্রাসায় বসে শহরের মাদক ব্যবসায়ীদের দেখভাল করছেন। স্থানীয় এ কে এম কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি এমপি লুত্ফুন নেসা। তাতে কি? এমপির স্বামী বলে কথা। গভর্নিং বডিতে সভাপতিত্ব করেন সুলতান মৃধা। এলাকায় বলাবলি হচ্ছে, এ কলেজ ছাড়াও মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালী মহিলা কলেজে অন্তত ২৫ জন শিক্ষক নিয়োগসুবাদে কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন এ দম্পতি। পটুয়াখালী পৌরসভা ও সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান সুলতান মৃধা বাস করেন জেলা শহরের পুরান বাজার এলাকায়। তার জমি দখল করার স্টাইল সম্পর্কিত কথাবার্তা বেশ উপভোগ্য। জানা গেছে, কারও বসতবাড়ি বা জমি গায়ের জোরে দখল করার আগে মৃধা সেখানে তার ক্যাডারদের পাঠান। তারা জমি মালিকের ওপর আক্রমণ চালায়। পরে আক্রান্ত ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধেই সন্ত্রাসী মামলা দায়ের করা হয়। সুলতান বাহিনীর প্রধান খোকন সম্প্রতি তারই এক প্রতিবেশীকে কুপিয়ে কাহিল করে দেন। এরপর ওই লোকটির বিরুদ্ধেই করা হয় সন্ত্রাসী হামলার অভিযোগে মামলা। এত কিছু যে হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে যত ক্ষোভ সবই আড়ালে-আবডালে। কোনো ক্ষুব্ধ ব্যক্তিই প্রকাশ্য হতে চান না। কারণ, কথিত আছে যে, সুলতান বাহিনীর বিরুদ্ধে কেউ ফোনে কিছু বললে সেই ফোনকল রেকর্ড সুলতানের হাতে চলে যায়। পরে তাকে ডেকে নিয়ে ফোন রেকর্ড শুনিয়ে চালানো হয় নির্মম নির্যাতন।

সুলতানের যত দখল :
পটুয়াখালী শহরের পুরান বাজার নদী সংলগ্ন চরে বিশাল খাস জমি দখল করে দোতলা বাড়ি করেছেন সুলতান। একই এলাকার বাসিন্দা যুধিষ্ঠির সাহার বাড়ি জবরদখল করে রেখেছেন তিনি। স্থানীয় ডা. চন্দন কুমার সাহার বিধবা মাকে দিয়ে সাদা কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে তার স্বামীর ভিটেমাটি থেকে তাকে উচ্ছেদ করেছেন সুলতান মৃধা। তিনি শহরের কলেজ রোডে বনানী হোটেলের উত্তর পাশে প্রয়াত হাজী শামসুর রহমান খান ও নৌবাহিনীতে কর্মকর্তা পদে কর্মরত তার দুই ছেলের জমি দখল করে নিজের অফিস বানিয়েছেন। সরকারি নীতিমালা ভঙ্গ করে পৌর এলাকার টাউন জৈনকাঠিতে কয়েকশ গাছ কেটে তৈরি করেছেন ইটভাটা। লোহালিয়া ঘাটের খাস জমিতেও ঝুলছে সুলতানের সাইনবোর্ড। কলাপাড়া উপজেলার রজোপাড়াতে ৬০ শতাংশ সরকারি খাস জমি দখল করে চালু করেছেন পলাশ ফিলিং স্টেশন। দেড় বছর আগে কলাপাড়ার তৎকালীন সাব-রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান তালুকদারের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে পায়রাবন্দর এলাকায় খাস জমি রেজিস্ট্রি করিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সাব-রেজিস্ট্রারও ভয়ে কারও কাছে নালিশ করেননি। সুলতান মৃধার অত্যাচারে ক্ষতিগ্রস্ত পটুয়াখালীর একাধিক ভুক্তভোগী ভয়ে নাম প্রকাশ করতে চাননি। তারা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আওয়ামী লীগের এক সিনিয়র নেতার নাম ভাঙিয়ে পটুয়াখালীতে পরের জমি নিজের করে নেওয়ার নিষ্ঠুর খেলায় মেতে রয়েছেন সুলতান মৃধা। সুলতান মৃধার পেশিশক্তির শিকার সালেহা বেগম তার জীবন ও সম্পদ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য গত ২৫ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন জানিয়েছেন। আবেদনপত্রে তিনি পটুয়াখালী ও বরগুনা থেকে সংরক্ষিত নারী আসনের (পটুয়াখালী-বরগুনা) সংসদ সদস্য লুত্ফুন নেসার সহযোগিতায় তার স্বামী কী কী অনাচার করেছেন তা বর্ণনা করেন। সালেহা বেগম রাষ্ট্রপতিকে জানান, তার স্বামী প্রাণিসম্পদ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত পরিদর্শক মরহুম হাজী শামসুর রহমান খান। সরকারি চাকরির সুবাদে এক মেয়ে ও পাঁচ ছেলে নিয়ে তিনি পটুয়াখালী শহরে বাস করতেন। তার সন্তানদের মধ্যে দুজন নৌবাহিনীতে অফিসার পদে কর্মরত। স্বামীর সারা জীবনের আয় আর পেনশনের টাকায় পটুয়াখালী জেলা সদরের পশু হাসপাতাল সংলগ্ন হোটেল বনানীর লাগোয়া ১০ শতাংশ এবং পরে সন্তান হাফিজ আল আসাদ ও সাজ্জাদুর রহমানের আয়ের টাকায় কেনা ১৪ শতাংশ জমিতে তিনি বাস করছিলেন। সালেহা বেগম বলেন, ‘কিছু দিন আগে ভুয়া আমমোক্তারনামা দেখিয়ে আমাদের ১৪ শতাংশ জমির ওপর সুলতান তার স্ত্রী মালিক মর্মে একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। একের পর এক আমার সন্তানদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেন সুলতান। তবে তদন্ত শেষে ওসব মামলা খারিজ হয়ে যাচ্ছে। এসব বিষয়ে জেলা ও পুলিশ প্রশাসন অবগত রয়েছে। অভিযোগ সম্পর্কে বক্তব্য জানার জন্য সুলতান মৃধা ও তার শ্যালক খোকন মৃধার সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। মুঠোফোন বরাবরই বন্ধ পাওয়া যায়। তাই বেশ কয়েকবার খুদে বার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু তাতেও তারা সাড়া দেননি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Pin It on Pinterest