দেখে আসুন কলকাতার তাজমহল

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বললে কলকাতার লোকজন দেখিয়ে দেবে সফেদ সুন্দর ভবনটিকে। ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসনের ঐতিহাসিক তথ্যের সবচেয়ে বড় সংগ্রহশালা এই স্মৃতিসৌধটি। স্মৃতিসৌধটির জিনিসগুলো মনযোগ দিয়ে দেখলে আর পড়লে ভারতবর্ষে বৃটিশদের আগমণ, তাদের শাসন এবং হিন্দুস্তান ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভের সমস্ত ইতিহাস খুব সহজে বুঝতে পারবে যে কেউ। ১৮৪ ফিট উঁচু স্মৃতিসৌধটি সাদা শ্বেত পাথর দিয়ে অনেকটা তাজমহলের অনুকরণে বানানো। স্থানীয় জনগণ ছাড়াও বিশ্বের অন্যান্য দেশের জনগণের কাছে আকর্ষণীয় স্মৃতিসৌধটি।

অনেকেই স্মৃতিসৌধটিকে পশ্চিমবঙ্গের তাজমহল বলে আখ্যায়িত করেন। স্মৃতিসৌধটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিশাল এক উদ্যান। আজও উদ্যানটি ধরে রেখেছে তার সৌন্দর্য। কলকাতাবাসী সকালে-বিকালে প্রকৃতির ছোঁয়া পেতে ছুটে আসেন এখানে। সবচেয়ে বেশি ভিড় পরিলক্ষিত হয় প্রাতঃভ্রমণের সময়। পড়ন্ত বিকালে শিশুদের নিয়ে সময় কাটাতে চলে আসেন অভিভাবকরা। সৌধের সর্বোচ্চ গম্বুজে বিউগল-ধারিণী বিজয়দ্যোতির একটি কালো ব্রোঞ্জমূর্তি রয়েছে। সৌধের সম্মুখভাগে রয়েছে শ্বেতপাথরের কয়েকটি সিঁড়ি। এসব সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় মূল ভবনে।

কলকাতার তাজমহল খ্যাত সেই স্মৃতিসৌধটির নাম ‘ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল’। ‘ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল’ রানী ভিক্টোরিয়ার স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত। ১৯০১ সালে ইংল্যান্ডের রাণী ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুর পর তত্কালীন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসর লর্ড কার্জন রাণীর স্মৃতি রক্ষার্থে একটি স্মারক প্রাসাদ ও উদ্যান প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন। ১৯০৬ সালে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় এবং ১৯২১ সালে এই প্রাসাদ ও উদ্যানের উদ্বোধন করা হয়। স্মৃতি-প্রাসাদটির প্রধান নকশাকার ছিলেন স্যার উইলিয়াম এমারসন। তিনি ব্রিটিশ ও মোগল স্থাপত্যরীতির সংমিশ্রণে এর নকশা প্রণয়ন করেন। এ কারণে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলকে বলা হয় ইন্দো-সারাসেনিক রীতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।

ভিক্টোরিয়া স্মৃতিসৌধের সবচাইতে দৃষ্টিনন্দন অংশ হল এই স্থাপত্যের ঠিক মধ্যভাগের একটি ডোম বা গম্বুজ। এই ডোমটির ঠিক নীচের ঘরটিকেই বলা হয় ‘কুইন্স’ হল’। আর এই ডোমটির ঠিক ওপরেই মধ্যস্থলে বসানো রয়েছে বিউগল হাতে ডানা মেলা ব্রোঞ্জের সেই বিশ্বখ্যাত পরীটি।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালকে জাদুঘর বানানো হয়েছে। সোমবার ছাড়া বাকি ছয়দিন খোলা থাকে। মেমোরিয়ালের ভেতরে অনেকগুলো গ্যালারি আছে। গ্যালারিগুলোতে আপনি ব্রিটিশদের শাসন আমলের অনেক নিদর্শন দেখতে পাবেন। মেমোরিয়ালটিতে বিদেশিদের প্রবেশমূল্য ২০০ রুপি এবং দেশীদের প্রবেশমূল্য ২০ রুপি।

এমন বিদেশি পর্যটক কমই আছেন যারা কলকাতায় গেছেন কিন্তু ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে একটিবার ঢুঁ মেরে আসেননি। দিনের আলোতে যতটা সুন্দর রাতের ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখতে তার থেকেই বহুগুণ মনলোভা। দূর থেকে মনে হয় কোনো স্বপ্নপুরী, কল্পনা জগতের প্রাসাদ এক। যে কাউকেই বিমোহিত করতে পারে মেমোরিয়ালের সৌন্দর্য। মুগ্ধ হতে পারেন এর বুকের ভেতর ঠাঁই করে নেয় শত বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের নানান নিদর্শনে। উপনেবেশিক আমলের বহু বহু ঘটনার সাক্ষী হয়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল স্মৃতিসৌধটি আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কলকাতা শহরে, বাংলার তাজমহল হয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Pin It on Pinterest